শিরোনাম

কৃষক। যারা দেশের মানুষের খাদ্যের যোগান দেয়। যারা খাদ্য সঙ্কট নিরসনে মূল প্রদায়কের ভূমিকা পালন করে। ধানের চারা রোপণের পর থেকে যারা ধানের কুশিতে কুশিতে স্বপ্ন বুনে। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ধান চাষ করে। সেই কৃষকের আশায় গুড়ে বালি পড়ে ধান যখন ঘরে আসে। কৃষক ধানের দাম পায় না- এ কথা প্রত্যেক মৌসুমেই লেখা হয়। রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা সবাই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকেন কিন্তু সমস্যা সমস্যাই রয়ে যায়। সমাধান আর হয় না। বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবমুখী চিন্তা ভাবনা না থাকার কারণে একাধারে ঠকছেন কৃষক ও ভোক্তা। কৃষক যেমন পান না তার পণ্যের ন্যায্যমূল্যে, তেমনি ভোক্তারাও নিষ্পেষিত হন মধ্যস্বত্বভোগীদের চক্রবাকে। এসব বিষয় নিয়ে কৃষক, মধ্যস্বত্বভোগী, নীতি নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ধানচাষির সুখ-দুঃখ নিয়ে তিন পর্বের একটি ধারাবাহিক রিপোর্ট আজ তৃতীয় ও শেষ পর্ব প্রকাশ করা হলো- মৌসুমের সময় শ্রমিক সঙ্কট ও তাদের চড়া মজুরি পরিশোধ করে ধানচাষে লাভ সম্ভব না। এবার বোরো মৌসুমে ধান চাষ করে কৃষক তার মূলধন হারিয়ে ফেলেছেন। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের মতে, ধান চাষে লাভ করতে হলে কৃষককে যান্ত্রিকীকরণে আসতে হবে। যন্ত্রের মাধ্যমে চাষাবাদ করলে খরচ যেমন কম হয় তেমনি ফসল ফলে বেশি। এছাড়া গতানুগতিক পদ্ধতিতে ফসলের অপচয় হয়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। গতানুগতিক পদ্ধতি ও যান্ত্রিকীকরণ পদ্ধতির তুলনা করে দেখা গেছে কৃষিতে টিকে থাকতে হলে যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। বোরো ধান- সেচ, সার ও কীটনাশক নির্ভর ধান। এর জন্য প্রয়োজন নিবিড় পরিচর্যা ও আর্থিক খরচ। কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এবং সাধারণভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, বীজতলা তৈরি, চারা লাগানো, নিড়ানি দেওয়া, ধান কাটা মাড়াইসহ ঘরে তোলা পর্যন্ত ১ বিঘা জমিতে কৃষি মজুর লাগে ২৫ জন। বীজের দাম, সারের দাম, তিনবার সেচ দেওয়া, দুইবার কীটনাশক প্রয়োগ করা ও জমির ভাড়াসহ (বা খাজনা) ১ বিঘা জমিতে ধান চাষে খরচ পড়ে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকা। ১ বিঘা জমিতে গড়ে ফলন হয় ১৮ থেকে ২০ মণ ধান। বোরো মৌসুমে কৃষককে ধান বিক্রি করতে হয় ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। এ ধান কেটে বিক্রি কৃষকের ঋণের টাকা পরিশোধ, মজুরি পরিশোধ, কীটনাশকের দাম, পানির টাকা পরিশোধসহ অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে কৃষক ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়। কৃষকরা জানান, যে স্বপ্ন ও আশা নিয়ে তারা ধান চাষ করেন, ধান ঘরে এলে সে স্বপ্ন ও আশার গুড়ে বালি পড়ে। এ প্রসঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রসারণ) মো. মোশারফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ফসল কাটা ও ফসল বপনসহ সিজনের সময় শ্রমের যে মজুরি কৃষককে গুণতে হয় তাতে যন্ত্র ছাড়া কোনো উপায় নেই। কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে যেমন অর্থ সাশ্রয় হয়, তেমনি সময় ও শ্রম সাশ্রয় হয়। কৃষিকাজে সবচেয়ে শ্রম ও সময়নির্ভর কাজ হচ্ছে চারা রোপন বীজ বপন ও ফসল কর্তন। মৌসুমের নিদিষ্ট সময় এ কাজগুলো সম্পন্ন করে ফসল ঘরে তুলতে সম্প্রতিকালে বাংলাদেশের কৃষকের বেশ সঙ্কটে পড়তে হয়। এ সময় কৃষি শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। কখনো কখনো দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও কৃষি শ্রমিক পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, শ্রমিকের অভাবে বিলম্বে ফসল কর্তন ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদিত শস্যেও বড় একটি অংশ নষ্ট ও অপচয় হয়। এ ছাড়া আগাম এবং সময় মতো ফসল বিক্রি করতে না পারলে কৃষক উপযুক্ত মজুরি পায় না। মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী বপনযন্ত্র দিয়ে বীজ বপন করতে পারলে ফসলে জীবনকাল ১০-১২ দিন কমানো সম্ভব। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাধ্যমে ‘খামার যন্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের মাধ্যমে ৫০ ভাগ পর্যন্ত উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। দেশের ৩শ’টি উপজেলায় ৩শ’টি যন্ত্রসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এখান থেকে কৃষকরা নিয়মিতভাবে ভাড়ায় যন্ত্রসেবা সুবিধা পাচ্ছেন। এটাও আস্তে আস্তে বাড়ানো হবে। বগুড়ার শফিকুল ইসলাম নামে এক কৃষক এ প্রতিবেদককে বলেন, তার তিন বিঘা জমিতে ভাড়া করা কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করে ধানের চারা লাগানো, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিস্কার কাজে ৪ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ একই পরিমাণ জমিতে শফিকুল ইসলামের বাড়ির পাশের চান মিয়া গতানুগতিক চাষাবাদে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। গবেষণা তথ্য মতে, এক একর জমির ফসল শ্রমিক দিয়ে কর্তন ও মাড়াই কাজে গতানুগতিক পদ্ধতিতে ব্যয় হয় ৮ হাজার ৬৬৮ টাকা। অথচ মিনি কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করে একই কাজে ব্যয় হয় ৩ হাজার ৯৪২ টাকা। অন্যদিকে এক একর জমিতে রাইস ট্রান্সপ্লান্ট দিয়ে চারা লাগাতে খরচ হয় ১৬শ’ টাকা। আর শ্রমিক দিয়ে ব্যয় হয় ৬ হাজার টাকা। এখানে লক্ষণীয় যে, কৃষি যন্ত্রের মাধ্যমে কাজ করার ফলে এক একর জমিতে গতানুগতিকের চেয়ে ৯ হাজার ১২৬ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। অর্থাৎ এই ৯ হাজার ১২৬ টাকা তার লাভ। কৃষিযন্ত্র দিয়ে চাষাবাদ ও ফসল কর্তন ও মাড়াই করলে শস্যের অপচয় বাঁচে ৫-১০ ভাগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. মির্জা এ বি আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, যেহেতু মৌসুমের সময় শ্রমিকের সঙ্কট হয়, তাছাড়া শ্রমিকের দামও বেশি থাকে সে জন্য আস্তে আস্তে শ্রমিক নির্ভরতা কমাতে হবে। যন্ত্রনির্ভর কৃষিতে না যেতে পারলে কৃষক আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হলে আমাদের কৃষিও যান্ত্রিকীকরণ করতে হবে। একই প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে কৃষি থেকে শিল্পের দিকে যাচ্ছে শ্রম শক্তি। ফলে শ্রমিক সঙ্কট দেখা যায় মৌসুমকালে। অতিরিক্ত মজুরি দিয়ে কাজ করানোর ফলে কৃষক লাভবান হতে পারে না। এ অবস্থা উত্তরণে আধুনিক যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকতে হবে। কৃষককে প্রশিক্ষিত করতে হবে। এছাড়া বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতির উপর বরাদ্দও বাড়ানোর প্রয়োজন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (চ.দা) কৃষিবিদ ড. মো.শাহজাহান কবীর জাগো নিউজকে বলেন, কৃষি শ্রমিক সঙ্কট কাটাতে উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নত বিশ্বে এ সমস্যার যেভাবে মোকাবেলা করে আমরাও সে দিকে যাব। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কৃষি যন্ত্রপাতির যে দাম তাতে হয়তো ঘরে ঘরে প্রতিটি যন্ত্র ক্রয় করা সম্ভব না। তবে সমবায় ভিত্তিক কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় করা গেলে সংশ্লিষ্ট সমবায়ের কৃষকরা লাভবান হবেন। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাগো নিউজকে বলেন, মৌসুমের সময় আমাদের দেশে যেভাবে কৃষি শ্রমিক সঙ্কট হয় তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কৃষি শ্রমিক সঙ্কট কাটাতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। উন্নত বিশ্বে এ সমস্যার যেভাবে মোকাবেলা করে আমরাও সে দিকে যাব। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে।